আদালতে মামলা চলমান-নগরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা
রংপুর সিটি করপোরেশনে ৮ বছর আগে চাকরিচ্যুত ২৫ জনকে গোপনে নিয়োগ
রংপুর সিটি করপোরেশনে বিগত আট বছর আগে চাকরিচ্যুত ২৫ জনকে কৌশলে গোপনে নিয়োগ দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক। এই ঘটনায় নগরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। দুটি স্মারকে এক বছরের জন্য তাদের নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হলেও, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, আয়কর কর্মকর্তা হিসেবে মাসিক ৯ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণ করে দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাবেক মেয়রসহ সুধিজনরা। সিটি করপোরেশন সুত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দুটি পত্রে ২৫ জনকে ‘অসাধারণ ছুটি’ দেখিয়ে গোপনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে এই নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, চাকরিচ্যুতদের নিয়োগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও প্রশাসক নিজের ক্ষমতাবলে কমিটির প্রতিবেদন উপেক্ষা করে তাদের নিয়োগ দেন। এর মধ্যে ৮৫৪ নম্বর স্মারকে গত ১১ মার্চ ১৭ জনকে সিটি করপোরেশনের কর আদায় শাখা, ট্রেড লাইসেন্স শাখা ও প্রকৌশল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ আদেশে বলা হয়, এই কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতিকালীন সময় ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য হবে এবং নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা তাদের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করার শর্তে পৃথক পৃথকভাবে অঙ্গীকারনামা দিয়ে চাকরিতে যোগদান করবেন। অপর ৮৫৫ নম্বর স্মারকে গত ১১ মার্চ আট জনকে ট্যাক্সেশন কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, মোটর মেকানিক, জনসংযোগ সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, পরিচ্ছন্নতা সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মাসিক বেতন সর্বনিম্ন আট হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এই আট জনের ক্ষেত্রেও চাকরিচ্যুতিকালীন সময় ‘অসাধারণ ছুটি’ এবং মামলা প্রত্যাহার করার শর্তে পৃথক পৃথকভাবে অঙ্গীকারনামা দিয়ে চাকরিতে যোগদানের কথা বলা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি করপোরেশনের ২ কর্মকর্তা জানান, আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সদস্য ও সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু ২০১৬ সালে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৩১ জনকে এক বছরের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরের বছর তাদের নিয়োগের সময় বর্ধিত না করায় চাকরি চলে যায়। এরপর ওই ৩১ জন কর্মচারী চাকরি ফিরে পেতে হাইকোর্টে মামলা করেন, যা এখনও চলমান। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি পাঁচ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর মেয়র পদে পুননির্বাচিত হন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ১৯ আগস্ট দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করা হয়। এরপর রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি দায়িত্ব পেয়ে চাকরিচ্যুত ৩১ জনের মধ্যে আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদধারী ছয় জনকে বাদ দিয়ে বাকি ২৫ জনকে গোপনে নিয়োগ দেন। বিষয়টি গোপন রাখার জন্য নিয়োগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অফিস আদেশ কার্যালয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আইন বহির্ভূতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আট বছর আগে চাকরিচ্যুত ২৫ জনকে গোপনে নিয়োগ দিয়েছেন। চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তারা হাইকোর্টে মামলা করলেও আদালত কোনো আদেশ দেননি এবং মামলাও প্রত্যাহার করেননি। তাহলে কোন আইনে তাদের নিয়োগ দিলেন প্রশাসক? আবার বেতনও করলেন বেশি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের ছয় সহযোগীকে বাদ দিয়ে চাকরিচ্যুত বাকি ২৫ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে তাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় নিয়োগ দেওয়া প্রশ্নের জবাবে শহিদুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন মেয়রও তো আদালতে মামলা থাকার পরও নিয়োগ দিয়েছিলেন। গোপনে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়ম মেনেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

Leave a Reply