পালিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শোক ॥ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ॥ ততদিন হাদি সকল বাংলাদেশীর বুকের মধ্যে থাকবেন’-প্রধান উপদেষ্টা
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির জানাজায় অংশ নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, যতদিন বাংলাদেশ আছে, ততদিন হাদি সকল বাংলাদেশির ‘বুকের মধ্যে থাকবেন’। শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজায় অংশ নেয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে ইউনূস বলেন, লক্ষ লক্ষ লোক আজকে এখানে হাজির হয়েছে। পথে ঢেউয়ের মত লোক আসছে। সারা বাংলাদেশ জুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজকে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা তাকিয়ে আছে হাদির কথা শোনার জন্য আজকে। বিদেশে যারা আছে, বাংলাদেশি এই মুহূর্তে তারাও হাদির কথা জানতে চায়। প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসি নাই এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো এবং চিরদিন থাকবে। বাংলাদেশ যতদিন আছে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না। সেনা বাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বেলা সোয়া ১টার দিকে হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আসাদগেট সংলগ্ন সংসদ ভবনে গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। বেলা আড়াইটায় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হাদীর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বক্তব্য রাখেন মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা আজকে তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি। তুমি যা বলে গেছ, সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি।

সেই ওয়াদা করার জন্য আমরা একত্র হয়েছি। সেই ওয়াদা শুধু আমরা নয়, পুরুষানুক্রমে বাংলাদেশের সব মানুষ পূরণ করবে। সেই ওয়াদা করার জন্যই আমরা তোমার কাছে আজকে এসেছি। সবাই মিলে, যে যেখানেই আছি, আমরা তোমার যে মানব প্রেম, তোমার যে ভঙ্গি মানুষের সঙ্গে উঠাবসা, তোমার যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবাই প্রশংসা করছে, সেটা আমরা মনে প্রাণে গ্রহণ করছি। যেটা যেন আমাদের মনে সবসময় জাগ্রত থাকে, আমরা সেটা অনুসরণ করতে পারি। তুমি আমাদেরকে এমন এক মন্ত্র কানে দিয়ে গেছ, সেই মন্ত্র বাংলাদেশের কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। এবং এই মন্ত্র চিরদিন আমাদের কানের পাশে থাকবে। সে মন্ত্র বাংলাদেশের বড় মন্ত্র হয়ে আমাদের জাতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তোমার মন্ত্র ছিল, ‘বীর উন্নত মমশির’। এই উন্নত মমশিরের যে মন্ত্র তুমি দিয়ে গেছ, সেটা বাংলাদেশি সন্তানের জন্মলগ্ন থেকে যতদিন সে বেঁচে থাকবে, নিজের কাছে বলবে। আমাদের শির কখনো নত হবে না। হাদির আদর্শ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সেই মন্ত্র তুমি আমাদেরকে দিয়ে গেছ। আমাদের সব কাজে সেটা আমরা প্রমাণ করব। আমরা দুনিয়ার সামনে মাথা উঁচু করে চলবো। কারো কাছে মাথা নত করবো না। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “প্রিয় হাদি, তুমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলে। এবং সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন কীভাবে করতে হয়, তারও একটা প্রক্রিয়া জানিয়ে গেছে আমাদেরকে। সেই প্রক্রিয়া যেন আমরা সবাই মিলে গ্রহণ করি, যে কিভাবে প্রচার প্রচারণা কার্য চালাতে হয়, কিভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়, কিভাবে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়, কিভাবে বিনীতভাবে মানুষের কাছে আসতে হয়, সবকিছু তুমি শিক্ষা দিয়ে গেছ। আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করলাম। আমরা এই শিক্ষা চালু করতে চাই। আমরা সবাই আমাদের জীবনে, আমাদের রাজনীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই, যাতে হাদি আমাদের জীবনে স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকে। হাদি, তুমি হারিয়ে যাবে না।

তুমি কোনোদিন কেউ তোমাকে ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমাদেরকে তোমার মন্ত্র পুনঃপুন যে মনে করিয়ে দেবে। আমরা সেই মন্ত্র নিয়ে আজকে সামনের পথে এগিয়ে যাব। তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে ওয়াদা করলাম। আজকে তোমাকে আল্লাহর হাতে আমানত রেখে গেলাম। আমরা সবসময় তোমার কথা স্মরণ রেখে জাতির অগ্রগতির পথে চলতে থাকবো। হাদির জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই দলে দলে মানুষ আসছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। দুপুর ১টার দিকেই প্রশস্ত ওই সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের কারো মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা, কেউ আবার গায়ে জড়িয়েছেন পতাকা। অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আমরা সবাই হাদি হব যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’।
জানাযা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) তিনটার দিকে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে শনিবার দুপুরে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজার নামাজ পড়ান তার বড় ভাই। হাদির জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যান্য উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এরপর তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়। আততায়ীর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সকালে সচিবালয়সহ ঢাকার বেশ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত দেখা যায়। আগের দিন বাদ জুমা দেশের প্রতিটি মসজিদে ওসমান হাদির মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়গুলোতেও আয়োজন হয় বিশেষ প্রার্থনার। ওসমান হাদির কফিন সিঙ্গাপুর থেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছার পর রাখা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে। উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদির উপর আক্রমণ হয়। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে এসে দুজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবারের ইচ্ছায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।