নবীগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র দাসের ৮ম মৃত্যু বার্ষিকী পালিত
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস ও ৮ম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সেক্টরের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ-২ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান শিক্ষক ও নবীগঞ্জের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্র চন্দ্র দাসের সমাধিতে পারিবারিক পরিসরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন-বীর মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র দাসের স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা রত্না দাশ, অনুজ কবিন্দ্র চন্দ্র দাস, পুত্র রত্নদীপ দাস রাজু ও রত্নেশ্বর দাস রামু, গ্রন্থাগারের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ফোরামের সহ-সভাপতি জনি দাস, ভাতিজি সৃষ্টি রাণী দাস, ভাতিজা জিৎ দাস, নাতি দীপ শেখর দাস, নাতনি মমীসহ পরিবার পরিজন। বীর মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র দাস ১৯৫৪ সালের ৩১ জানুয়ারি নবীগঞ্জ উপজেলার মুক্তাহার গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দীগেন্দ্র চন্দ্র দাস। পিতামহ দীননাথ দাস ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের স্থানীয় সংগঠক ও ব্রিটিশ শাসনামলের নবীগঞ্জ থানার ৩৯নং সার্কেলের সরপঞ্চ। পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন সংস্কৃতমনা। ছাত্রজীবনে তিনি যাত্রাদলে অভিনয় ও গানের ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স ছাড়াই ছাত্রজীবনে বাউলসংগীত ও লোকসংগীতে পারদর্শিতার পাশাপাশি অভিনয়েও সমান পারঙ্গমনতা অর্জন করেন। তাছাড়া ফুটবল, হাডুডু, দৌড়, সাঁতার, বক্তৃতাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় হবিগঞ্জ মহকুমাসহ বৃহত্তর সিলেটের মধ্যেও বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি ছাত্র হিসেবে যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি বৃন্দাবন কলেজের ছাত্র সংসদ রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। অংশগ্রহন করেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচীতে। এই সময়টা অর্থ্যাৎ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালটা ছিল উত্তাল। এই সময়ে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক কর্মকান্ডে হবিগঞ্জ আসলে, তাঁদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগও হয় তাঁর। মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর (হবিগঞ্জের) রক্তে আগুনলাগা জ্বালাময়ী ভাষণে উদ্ভুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকা মুক্ত করার সংগ্রামে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশ জুড়ে যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন যুবক রবীন্দ্রও স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যুদ্ধে যোগদানের প্রত্যয় নিয়ে বাড়ী ফিরেন। নবীগঞ্জে এসে মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি পুরুষ জননেতা শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবু) এর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন।
এরই মধ্যে তিনি পরিবার-পরিজন সহ ভারতে গমন করে মৈলাম শরনার্থী ক্যাম্পে পরিবার-পরিজনদের রেখে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে উপস্থিত হন। ৫নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মীর শওকত আলী (পরবর্তীতে লে.জেনারেল) তাঁকে রিক্রুট করেন। মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে ৫ নং সেক্টরের ৩০ জনের চৌখোস ও শিক্ষিত একটি যুবকদের নিয়ে স্পেশাল ব্যাচ-২ গঠন করলে, এই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন রবীন্দ্র চন্দ্র দাস। ইকোওয়ান-এ ইন্টেলিজেন্ট ব্রাঞ্চের কার্যক্রমের উপর ২১ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহনের পর ডিংরাই ইয়ুথ ক্যাম্প প্রশাসক ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট (অব:) নরেন্দ্র চন্দ্র বসাকের (এন সি বসাক) নির্দেশে তিনি ৫নম্বর সেক্টরের টেকারঘাট সাব-সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন মোসলেম উদ্দিন ওরফে দীন মোহাম্মদ এর অধীনে মুক্তিযুদ্ধের স্বশস্ত্র পর্বে অংশগ্রহন করেন। তিনি-ভাতেরটেক, পলাশ, আমবাড়ি, বৈষেরভের, চিনাকান্দি, গৌরারং, টেংরাটিলা, ডলুয়া প্রভৃতি স্থানে সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ করেন। ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭১-এ বিজয় অর্জনকারী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। উল্লেখ্য যে, তাঁর নিজ গ্রামে তাঁর নামানুসারে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী রবীন্দ্র চন্দ্র দাস গ্রন্থাগার’ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাঁর ৮ম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ১৮ ডিসেম্বর বিদেহী আত্মার শান্তি ও সদগতি কামনায় তাঁর নিজ বাড়িতে পরলৌকিক ক্রিয়াদি তথা একোদ্দিষ্ঠ শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হবে।