আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চলমান মামলার ৫৪তম ও শেষ সাক্ষী হিসেবে মূল তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) মো. আলমগীরের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এদিন দুপুরে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন এবং শপথ গ্রহণের পর তার জব্দকৃত ১৭টি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন। এসব ভিডিওতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের নৃশংস ও ভয়াবহ দৃশ্য ফুটে ওঠে। প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি ভিডিও প্রদর্শিত হয়, এরপর একে একে বাকি ভিডিওগুলো দেখানো হয়। এর মধ্যে গত বছরের ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা বা নাতিপুতি’ আখ্যায়িত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের চিত্রও তুলে ধরা হয়। এছাড়াও, রংপুরে ও রাজধানীর চানখারপুলে পুলিশের পাশবিকতার ভিডিও, আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং গত বছরের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের চালানো হত্যাযজ্ঞ নিয়ে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত হয়। এসব ভিডিও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তাদের সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, তানভীর হাসান জোহাসহ অন্যান্য প্রসিকিউটরগণ। এর আগে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর মামলার ২২তম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়। ওইদিন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা সাক্ষ্য দেন এবং তাকে শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন জেরা করেন। তানভীর জোহা তদন্তকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৬৯টি অডিও ক্লিপ ও তিনটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) জব্দ করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তিনি পাঁচটি অডিও কথোপকথন সম্বলিত তিনটি সিডি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন এবং সেসব ফোনালাপ শোনানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়, যাদের মধ্যে দুজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার রেকর্ড ও লাইব্রেরি ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। ২২ সেপ্টেম্বর ৪৯তম সাক্ষী হিসেবে শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী জবানবন্দি দেন, যার মধ্য দিয়ে প্রসিকিউশনের ঘটনার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলেই যুক্তিতর্ক শুরু হবে এবং এরপর রায় ঘোষণা করা হবে। এদিকে, শেখ হাসিনার এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আজও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়, যার সামনে সাক্ষীরা জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দেশজুড়ে চালানো হত্যাযজ্ঞের বীভৎস বর্ণনা উঠে এসেছে। শহীদ পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এসবের জন্য দায়ী শেখ হাসিনা, কামালসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। এই মামলায় ৮১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। গত ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *