‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজ’
অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী-নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে ফৌজদারী মামলা দায়ের
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বনামধ্যন্য বিদ্যাপীঠ ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজ’র অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী, নির্যাতন, হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একটি ফৌজদারী মামলা দায়ের হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর/২৫ সদর মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন একই কলেজের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মোহাঃ জোনাব আলী। মামলা নং ১১।
মামলার বিবরণে জানা যায়, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলি ও তার ছেলে নাফিস এজাজ যোগসাজস করে এবং এজাবুল হক বুলির নির্দেশে নাফিস এজাজ গত ২৭/৪/২০২৫ইং তারিখ বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে ০১৮০৪৭২০৯৪৮ নম্বর থেকে হোয়াটস এ্যাপে বাদী মোহাঃ জোনাব আলীর উদ্দেশ্যে কমেন্ট করে যে, ‘হাত-পা থাকতে হাত-হাত-পায়ের যত্ন কর’, ‘রগ থাকতে রগের যত্ন কর’। এছাড়াও কিছু হুমকীমূলক কমেন্টের মাধ্যমে তাকে জীবন নাশের হুমকী প্রদান করেন। এছাড়া একই নম্বর থেকে একই ব্যক্তি ফেসবুক আইডি লিংক নং https://www.facebook.com/profile.php?id=61556830680530 খুলে গত ৩০/০৪/
গত ৩০/০৪/২০২৫ইং তারিখ তাকে অশালীন ভাষায় গালি এবং আক্রমণাত্মক হুমকী দেয়। এর প্রেক্ষিতে এই নম্বরে জোনাব আলীর ছেলে গত ৩০/০৪/২০২৫ তারিখে কল করলে নাফিজ এজাজ অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হকের ছেলে পরিচয় দিয়ে হুমকী দেয় যে, আমার আব্বা বলেছে, তোর আব্বাকে যে কোন সময় মেরে ফেলবে। এছাড়া মোহাঃ জোনাব আলীর নামে একটি ফেক আইডি খুলেও একই নম্বর থেকে অশালীন কমেন্ট করে জোনাব আলীর ভাবমূর্তি নষ্ট করে হুমকী দিয়ে চলেছেন। এছাড়াও অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক জোনাব আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ তৈরী করে তা তার স্ত্রীর ফেসবুক আইডিতে গত ১৫/০৩/২০২৪ইং তারিখে প্রকাশ করেও তাকে হুমকী প্রদান করেছেন। এজাহারে আরো উল্লেখ আছে, আসামী এজাবুল হক বুলি তার কাছে কয়েক দফায় অবৈধভাবে বিভিন্ন কৌশলে বাধ্য করে লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করেন। আরো কয়েকজন শিক্ষকের কাছেও তিনি জোর করে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করেছেন, যার অডিও রেকর্ড কলেজের কয়েকজনের কাছে সংরক্ষিত আছে। অধ্যক্ষ তার ‘চাকরী খেয়ে নিব’ বলে প্রায়ই হুমকী দিতেন এবং তার অফিসে ডেকে মারাত্মকভাবে অপমান করে বের করে দিতেন। তিনি তার চাকরী খেয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবেদনও করেন। সেই আবেদনের তদন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অধ্যক্ষ মামলার বাদী প্রভাষক জোনাব আলীকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করার জন্য হাইকোর্টে একটি মিথ্যা রীট মামলা দায়ের করেছেন।
জোনাব আলীর অভিযোগ, অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক ছলে-বলে-কৌশলে তার উপর বিভিন্ন প্রকার মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে তিলে তিলে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে হুমকী দিয়ে আসছেন। তিনি (অধ্যক্ষ) গত ১৭/১০/২০২৩ইং তারিখ দুপুর ২টার দিকে কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের ছুটি দিয়ে তাকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আটকিয়ে রেখে শারীরিক ও মানসিকসহ নানাভাবে নির্যাতন করেন। ঘটনার খবর পেয়ে তার ছেলে কলেজে এসে তাকে অসুস্থ অবস্থায় বিকেল সাড়ে ৪টায় বাসায় নিয়ে যায়। এরপর তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। এজাহারে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক শিক্ষকদের সামনে প্রায়ই কলেজে তাকে হুমকী দেখান যে, তিনি মহারাজপুরের চেয়ারম্যান থাকাকালে কাকে কাকে মেরেছেন, সেটি যেন জোনাব মনে রাখে।
অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক আওয়ামীলীগ আমলে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত ছিলেন বলে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করে কোনো ফল পাননি এবং এ কারণেই আগে মামলা করাও সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি জুলাই/২৪ আন্দোলনের স্বৈরাচার পতনের পর থেকে (৫ আগষ্ট) অদ্যবধি কলেজে অনুপস্থিত থেকেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছেন বলে শঙ্কাবোধ করায় তিনি মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য, তার বিরুদ্ধে আরো একটি চাঁদাবাজির মামলা পেন্ডিং রয়েছে, যার নম্বর ২২, তারিখ ১৩/০৬/২০০৭। এছাড়া একটি হত্যা মামলায় এজাবুল হক গত ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখ থেকে দীর্ঘদিন জেলখানায় ছিলেন। এ মামলার নম্বর ২৮, তারিখ ২৫/১২/২৫। পরে তিনি হত্যা মামলায় জামিনে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন।
তার বিরুদ্ধে ইভটিজিং, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২/৩টি তদন্ত হয়েছে এবং এতে তার বহু অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি তার চাঁদাবাজির একটি কল রেকর্ড ফাঁসও হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যেখানে তিনি একজন মহিলা শিক্ষককে চাঁদা দিতে বিভিন্ন কৌশলে বাধ্য করছেন। এ কল রেকর্ডে তার বিরুদ্ধে আরো ৪ জনের অভিযোগ রয়েছে। কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষিকা জানান, অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক কলেজের শিক্ষকদের কাজে ঢাকা যাবেন বলে ২০২১ সাল থেকে বহুবার জোর করে, কখনো কৌশল করে লাখ লাখ টাকা (যার পরিমাণ ৫০ লাখ টাকাও) হতে পারে, যা চাঁদা হিসেবে আদায় করেন। উল্লেখ্য যে, অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলি গত ২৪ এর ৫ আগস্টের পর কলেজে অনুপস্থিত রয়েছেন (স্বৈরাচার আ’লীগ পতনের ১১ মাস পর কলেজে আসেন মাঝে মধ্যে ১৫ মিনিট থেকে আধা ঘন্টার জন্য, একরকম লুকিয়ে আসেন, তড়িঘড়ি করে কলেজ থেকে বেরিয়েও যান)। তার বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর আদেশে রাজশাহী মাউশির পরিচালকের নেতৃত্বে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ও ২৭ নভেম্বর দুটি তদন্ত হয়। তদন্তে তার দোষ প্রমাণিত হওয়ায় গত ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ তারিখে তাকে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করা হয়। ১০টি প্রমাণিত অভিযোগের জবাব দেয়ার জন্য তাকে ১০ দিন সময় দেয়া হয়। কিন্তু তিনি অদ্যবধি সে নোটিশের জবাব না দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে অপরাধ ঢাকার জন্য কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে, গত ২৬/৪/২০২৫ইং তারিখে কলেজের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মোহাঃ জোনাব আলীর মাউশির মহাপরিচালক বরাবর দেয়া অভিযোগ এর প্রেক্ষিতে গত ৫/৬/২০২৫ইং তারিখ মাউশির মহাপরিচালক মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিবকে এ বিষয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি প্রেরণ করেন।
আরো উল্লেখ্য যে, অধ্যক্ষ এজাবুল হক পলাতক থাকায় কলেজ পরিচালনা স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে গত ১৪/১১/২০২৪ইং তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মোঃ মেসবাহুল আলম নামে একজন অধ্যাপক’কে ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজে পদায়ন করা হয়। তিনি ১৭ নভেম্বর যোগদান করে ২০ মে ২০২৫ পর্যন্ত কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করে আব্দুলপুর সরকারি কলেজে গত ২১ মে/২৫ অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। প্রায় ১ বছর পর এজাবুল হক মাঝে মধ্যে কলেজে প্রবেশ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তিনি তার অফিস কক্ষ খোলার অনুমতি না পাওয়ায় যত্রতত্র বসে অফিস করেন। বৈষম্য বিরোধী ও কলেজের শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তার পদত্যাগের দাবিতে গত জুলাই আন্দোলনকালীন সময়ে পলাতক থাকায় অধ্যক্ষের কক্ষে তালা দিয়ে মিছিল সহকারে জেলা প্রশাসক এর দপ্তরে গিয়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খানের কাছে সেই চাবি জমা দেন বলে জানা যায়। পদায়নকৃত অধ্যক্ষ মোঃ মেসবাহুল আলম ১৭ নভেম্বর ২০২৪ থেকে ২০ মে ২০২৫ পর্যন্ত কলেজে দায়িত্ব পালন করলেও তিনিও ডিসি অফিসে আবেদন দিয়েও অফিস কক্ষ খুলতে পারেননি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশি থেকে এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত অফিস খোলা ফৌজদারী অপরাধ হওয়ায় না খোলাই উত্তম’।
এছাড়াও অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলির বিরুদ্ধে জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক মানবজমিন’, ‘সমকাল’, ‘আমাদের বার্তা’, স্থানীয় দৈনিক ‘দৈনিক চাঁপাই দর্পণ’, ‘সাপ্তাহিক সোনামসজিদ’, ‘শিক্ষা ডটকম’সহ প্রায় ২০/২৫টি পত্রিকায় বিশেষ সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও সদর উপজেলার বিভিন্নস্থানে স্বৈরাচার আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অনেক লোকজনের কাছ থেকে নেয়া মোটা অংকের টাকা (দেনাদারের টাকা) পরিষোধ করার ভয়েও অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলি নিজেকে অনেকটায় লোক চক্ষুর আড়াল হয়ে চলাফেরা করছেন বলেও জানা গেছে। অধ্যক্ষ বুলির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা স্বত্ত্বেও তিনি অদৃশ্য কোন্ ক্ষমতা বলে ১ বছর পর কলেজে প্রবেশ করে এখনো অধ্যক্ষ হিসেবে বহাল তবিয়তে আছেন, সে প্রশ্ন এখন সর্ব মহলের। অধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলির বিরুদ্ধে হওয়া অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় এবং কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন কলেজের ভূক্তভোগী শিক্ষকগণ ও বিশেষজ্ঞ মহল।

Leave a Reply