ঘুমন্ত আরব, নিষ্ঠুর বিশ্ব: গাজার রক্তাক্ত আর্তনাদ কেন কানে যায় না?

ঘুমন্ত আরব, নিষ্ঠুর বিশ্ব: গাজার রক্তাক্ত আর্তনাদ কেন কানে যায় না?

গাজা আজ শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়, এটি মানবতার বিবেকের কবরস্থান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সর্বশেষ যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৪৫,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে (গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী), যার মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি নারী ও শিশু। হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির—কোনো স্থানই নিরাপদ নয়। অথচ আরব বিশ্বের রাজপ্রাসাদগুলোতে এখনো গভীর নিদ্রা। তেলের ঝর্ণা বইছে, দুবাইয়ের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আরো উঁচু হচ্ছে, রিয়াদে কনসার্ট হচ্ছে, কায়রোতে টেলিভিশন নাটকের শুটিং চলছে। গাজার শিশুর আর্তনাদ কি তাদের কানে পৌঁছয় না? নাকি পৌঁছলেও সেটা আর ‘রাজনৈতিক স্বার্থ’-এর কাছে মূল্যহীন?
আরব লীগের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল ২০২৩-এর নভেম্বরে। সেখানে কথা হয়েছিল ‘কঠোর নিন্দা’র। কিন্তু তেল রপ্তানি বন্ধ? ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন? সামরিক জোট গঠন? একটিও হয়নি। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এ গাজার কোনো স্থান নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছে ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির পর। মিশরের সীমান্তে রাফাহ গেট খোলা হয় শুধু ‘মানবিক সাহায্য’র নামে ছবি তোলার জন্য, কিন্তু অস্ত্র বা যোদ্ধা প্রবেশ? সেটা ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ প্রশ্ন! জর্ডানের রানি রানিয়া ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হয়েও রাজ পরিবারের নীরবতা ভাঙতে পারেননি। অথচ একই আরবরা ১৯৭৩ সালে তেল অস্ত্র ব্যবহার করে পশ্চিমকে হাঁটু গেড়ে বসিয়েছিল। আজ সেই সাহস কোথায় হারিয়েছে?
এর কারণ একাধিক। প্রথমত, আরব বিশ্ব এখন শিয়া-সুন্নি বিভক্তির গভীর গর্তে আটকে গেছে। ইরান যখন হুথি, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ করছে, তখন সৌদি-আমিরাত-মিশরের শাসকগোষ্ঠী ইরানকে বড় শত্রু মনে করে, ফিলিস্তিনকে নয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বার্থ। গাল্ফ দেশগুলোর অর্থনীতি এখন ইসরাইলের প্রযুক্তি ও আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। গাজার পক্ষে বড় আন্দোলন হলে নিজ নিজ দেশের রাস্তায় ‘আরব বসন্ত-২’ শুরু হওয়ার ভয়। তাই শাসকরা মসজিদে খুতবা দেন, টেলিভিশনে কান্নার থিয়েটার করেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি বদলান না।
আর পশ্চিমা বিশ্ব? সেখানে তো বিবেক মরে গেছে অনেক আগেই। আমেরিকা ইসরাইলকে ২০২৪ সালেই ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। বাইডেন প্রশাসন ১৪ বার ভেটো দিয়েছে জাতিসংঘে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে। ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স-সবাই একই সুর। ইউরোপের রাস্তায় লাখো মানুষ মিছিল করছে, কিন্তু তাদের সরকারগুলো বলছে, “ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে”। অথচ সেই আত্মরক্ষার নামে গাজার ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, ১.৯ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু। জাতিসংঘের মতে, গাজা এখন শিশুদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। কিন্তু বিবিসি-সিএনএন-ফক্স নিউজের ভাষ্যে এটা ‘ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ’, যেন দুই সমান শক্তির লড়াই। একপক্ষের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, অন্যপক্ষের কাছে হাতে তৈরি রকেট-একে কি সমান যুদ্ধ বলা যায়?
আন্তর্জাতিক আইন? আইসিজে ইসরাইলকে গণহত্যার অভিযোগে বিচার করছে, কিন্তু কে শোনে? আইসিসি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে-ইউরোপের কোন দেশ সেটা কার্যকর করার সাহস দেখিয়েছে? উল্টো হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক বলছে, “আমরা মানব না”। এটাই আজকের বিশ্ব ব্যবস্থা-যেখানে শক্তিই ন্যায়।
তবু কিছু আলোর ঝলক আছে। ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজ আটকে ইসরাইলের অর্থনীতিতে আঘাত হানছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজেতে গণহত্যা মামলা করেছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে কিছুটা কণ্ঠ উঠছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কিন্তু এসব যথেষ্ট নয়। গাজার মানুষের জন্য প্রয়োজন একটি ঐক্যবদ্ধ আরব-মুসলিম বিশ্ব, যে বিশ্ব ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভাগ হওয়ার সময় যুদ্ধ করেছিল, ১৯৬৭-এ ছয় দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয়েও হাল ছাড়েনি। সেই আরব জেগে উঠলে বিশ্বকে জাগতে হবে।
আজ গাজা শুধু ফিলিস্তিনের নয়, এটা মুসলিম উম্মাহর ইজ্জতের প্রশ্ন। এটা মানবতার পরীক্ষা। যতদিন আরব শাসকরা নিজেদের সিংহাসন বাঁচাতে গাজাকে বলি দেবে, ততদিন ইসরাইলের বোমা পড়তেই থাকবে। আর যতদিন পশ্চিমা বিশ্ব ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা’র নামে দ্বিমুখী নীতি চালাবে, ততদিন বিবেক মরতেই থাকবে।
ঘুমাও আরব, ঘুমাও বিশ্ব। কিন্তু মনে রাখো, যে জাতি নিজের ভাইয়ের রক্ত দেখেও ঘুমায়, একদিন তার নিজের রক্তেই সে জেগে উঠবে—ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। গাজার শিশুরা আর কতদিন অপেক্ষা করবে?

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *