গভীর নলকূপে ট্র্যাজেডির পর সাজিদের শেষ বিদায়ে মানুষের স্রোত ॥ কান্নায় ভেঙে পড়ল গ্রামবাসী
রাজশাহীর তানোরে গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে প্রাণহারা দুই বছরের শিশু সাজিদকে শেষ বিদায় জানাতে শুক্রবার সকাল থেকেই গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কোয়েলহাট পূর্বপাড়ার আকাশজুড়ে নেমে আসে নাও বোঝা এক শোকের ছায়া। মসজিদের মাইকে মর্মান্তিক ঘোষণার পর থেকেই গ্রামের মানুষ হেঁটে, দৌঁড়ে, ছুটে চলে আসে সাজিদের বাড়ির দিকে—আরেকবার দেখতে সেই নিষ্পাপ মুখটি, যে মুখে প্রতিদিন ছিল হাসির ঝিলিক, আজ যা নিথর। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নেককিড়ি কবরস্থানের সামনের বিশাল মাঠে জানাজার আগেই মানুষের ঢল নামে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার চোখে টলমল জল, সবার মুখে একই আর্তনাদ—“আল্লাহ, এমন মৃত্যু কারও ঘরে না দিও।” সাদা কাপড়ে মোড়ানো সাজিদের ছোট্ট দেহটি জানাজা ময়দানে আনা মাত্র কান্নায় ভেঙে পড়ে চারদিক। শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন শিশুটির মা—বারবার ছুটে যেতে চাইছিলেন ছেলের দিকে। স্বজনরা ধরে রাখলেও থামাতে পারেননি তার বুকফাটা আর্তনাদ।
জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন কাজী মাওলানা মিজানুর রহমান। নামাজ শেষে যখন তাকবির ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে, তখন হাজারো হাত দোয়ার ভঙ্গিতে এক হয়ে যায়—সাজিদের মাগফিরাতের জন্য, তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য আল্লাহর রহমত ও ধৈর্যের প্রার্থনা করে।

জানাজার পর যখন সাজিদের ছোট্ট কফিনটি কবরের দিকে নেওয়া হয়, মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। বাতাস পর্যন্ত নিস্তব্ধ—শুধু শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ। স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব—কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এক শিশুর জানাজায় পুরো গ্রামের এমন সমবেদনার দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি কোয়েলহাট পূর্বপাড়া।
মর্মান্তিক এই ঘটনার সূত্রপাত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। খেলতে খেলতে সাজিদ গভীর নলকূপের ৪০ ফুট নিচের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অবিরাম প্রচেষ্টায় ৩২ ঘণ্টা মাটি খুঁড়ে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু প্রাণ ছিল না—তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।এক গ্রামের বুক চিরে যাওয়া এই মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দিল—একটি শিশুর জীবন কত মূল্যবান, আর অবহেলার ছোট ভুল কত বড় শোক বয়ে আনতে পারে। কোয়েলহাট গ্রাম এখনও কাঁদছে সাজিদের জন্য; কাঁদছে এক টুকরো নিষ্পাপ হাসি হারানোর বেদনায়।

Leave a Reply