শিল্পটিকে রক্ষার দাবী বিশিষ্টজনদের
হারিয়ে যাওয়া ভেড়ার লোমের বস্ত্র তৈরীর একমাত্র কারিগর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল খালেক
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে ভেড়ার লোম দিয়ে তৈরি হচ্ছে জায়নামাজ, শীতের কম্বল ও মাফলার। শুনতে অবাক লাগলেও এই প্রাচীন ও স্বাস্থ্যসম্মত শিল্পটি আজও টিকে আছে একজন মানুষের হাত ধরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা মোমিনপাড়া মহল্লার প্রায় সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল খালেকই এখন ভেড়ার লোমের কম্বল তৈরির এই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের শেষ কারিগর। কিশোর বয়সে বাবার কাছ থেকে শেখা এই কাজই হয়ে উঠেছে আব্দুল খালেকের জীবনের পরিচয়। তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। আমার বাবা তার বাবার কাছ থেকে শিখেছে। শিখতে শিখতেই আজ আমার বয়স সত্তর পেরিয়েছে। একসময় নবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভেড়ার লোম কেটে তৈরি হতো উষ্ণ ও টেকসই কম্বল।
![]()
সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। সবাই পেশা বদল করলেও আব্দুল খালেক এখনো ধরে রেখেছেন শত বছরের পুরনো সেই কৌশল। তিনি জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি কমে গেছে। যুবক বয়সে দুই-তিন দিনে একটি কম্বল বানানো যেত। এখন আট-দশ দিন, কখনো পনেরো দিনও লাগে। তবুও এই কাজ করেই সংসার চালাই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশেষ কাঁচি দিয়ে কেটে আনা ভেড়ার লোম পরিষ্কার করে নিজের হাতে বুনে তৈরি করেন কম্বল, জায়নামাজ ও মাফলার। তার তৈরি পণ্যের চাহিদা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে। অনেকেই মাসখানেক আগেই অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেন। তবে বয়সের ভারে ক্লান্ত আব্দুল খালেকের দুশ্চিন্তা একটাই, এই শিল্পের উত্তরসূরি কে? তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি চলে গেলে আর কেউ এই কাজ ধরবে না। সারা বাংলাদেশে আর একজনও নেই যে এই কাজটা করে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আব্দুল খালেকের সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে যাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঐতিহ্য। এতে ভেড়ার লোম কাটার সুযোগ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পশুপালকরাও। তাই তারা চান, সরকারিভাবে এই পেশায় নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। স্থানীয় গবেষক অধ্যক্ষ সৈয়দ মোঃ মোজাহারুল ইসলাম বলেন,
![]()
ভেড়ার লোমের কম্বল তৈরির এই শিল্পটি অত্যন্ত প্রাচীন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আব্দুল খালেক আগ্রহী তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন। এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোঃ আব্দুর ওয়াহেদ জানান, ভেড়ার লোমের কম্বল স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব। বাজারজাতকরণ, মান উন্নয়ন এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এ জন্য আমরা সার্বিক সহযোগিতা করব। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিসিক এর সহকারী ব্যবস্থাপক মোঃ সাজিদুল ইসলাম জানান, লোকজ শিল্প সংরক্ষণে বিসিক সবসময় কাজ করছে। ভেড়ার লোম ভিত্তিক এই ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করা হবে।
![]()
বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও আজও চরকা ঘোরান আব্দুল খালেক। ভেড়ার লোমে বুনে চলেছেন ইতিহাসের উষ্ণ স্মৃতি। একজন মানুষ, একটি যুগ, তার হাতে তৈরি প্রতিটি কম্বল যেন হারিয়ে যেতে বসা এক শতাব্দীর জীবন্ত দলিল। এই শিল্পটিকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী বিশিষ্টজনদের।

Leave a Reply