তিলুয়া: শীতের গ্রামবাংলায় হারিয়ে যেতে বসা এক শিশুতোষ খাবার
শীত এলেই একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে দেখা মিলত একটি পরিচিত দৃশ্য। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে বসত হাট, আর সেই হাটের এক কোণে শিশুদের ভিড় জমে উঠত একটি ছোট দোকান ঘিরে। কারণ সেখানে পাওয়া যেত শীতের বিশেষ লোকজ খাবার-তিলুয়া।
তিলুয়া মূলত তিল ও গুড় দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার, যা শীতমৌসুমেই প্রস্তুত করা হতো। নতুন তিল ভেজে খেজুরের গুড় বা আখের গুড় মিশিয়ে হাতে হাতে এই খাবার তৈরি করতেন গ্রামের মানুষ। কোনো যন্ত্র বা ছাঁচ নয়, নিখাদ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি তিলুয়ার প্রতিটি টুকরো হতো আলাদা আলাদা রূপের।
একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আশপাশের অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি হাট ও মেলাতেই তিলুয়ার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশুদের কাছে এটি ছিল শীতের সবচেয়ে আনন্দের খাবার। স্কুল থেকে ফেরার পথে কিংবা মেলায় ঘুরতে গিয়ে এক টুকরো তিলুয়া হাতে পেলে শীতের কনকনে বাতাসও যেন আর কষ্টের মনে হতো না।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, তিলুয়া শুধু খাবার হিসেবে নয়, শিশুদের সামাজিক আনন্দেরও অংশ ছিল। বন্ধুরা মিলে ভাগ করে খেত তিলুয়া, গল্প করত, হাসত। সেই সময়কার গ্রামবাংলার সরল জীবনধারার সঙ্গে তিলুয়ার সম্পর্ক ছিল নিবিড়।
কালের বিবর্তনে আজ তিলুয়া প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক খাবারের সহজলভ্যতা, বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং লোকজ সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতার কারণে এই খাবারটি এখন আর নিয়মিত হাটে দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর তিলুয়ার নামই শোনেনি।
তবুও কিছু প্রবীণ কারিগর আজও শীত এলেই সীমিত পরিসরে তিলুয়া তৈরি করেন। কিন্তু ক্রেতার অভাব ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা এই পেশা ধরে রাখতে পারছেন না।
তিলুয়া হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি খাবারের বিলুপ্তি নয়, হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার একটি সংস্কৃতি ও শৈশবের স্মৃতি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা গেলে তিলুয়ার মতো খাবার আবার নতুন করে পরিচিত হতে পারে।
শীতের সকালে তিল আর গুড়ের মিশ্রণে তৈরি তিলুয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়-গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এখনো আমাদের অপেক্ষায় আছে, যদি আমরা তাকে ধরে রাখি।

Leave a Reply