৫৩টি খালের খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ জনগণের উপকারেই দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি-প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যারা সর্বদা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। জনগণের উপকারের লক্ষ্য নিয়েই আমরা আবারও দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে সারা বাংলাদেশে এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে সাহাপাড়া খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা দেশের মানুষের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা জানি, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন এবং তাদের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি-কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকদের স্বস্তি দিতে ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাহারোল উপজেলা থেকে একযোগে দেশের ৫৩টি খালের খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনকালে তিনি নিজেই কোদাল হাতে মাটি কেটে এই মহতী কার্যক্রমের সূচনা করেন। এরপর তিনি সেখানে একটি ফলদ গাছের চারা রোপণ করেন। কর্মসূচির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে পুরো উত্তরবঙ্গে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

উল্লেখ্য, সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে বিমানযোগে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে দিনাজপুরের কাহারোলে কর্মসূচিস্থলে যান। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের কৃষি সেচ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখ্য, সাহাপাড়ার প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খননের ফলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। এতে অতিরিক্ত বন্যা থেকে সুরক্ষা মিলবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের সুবিধা পাওয়া যাবে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দিনাজপুরে যে খাল কেটেছিলেন, পাঁচ দশক বাদে সেই সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কাজের সূচনা করলেন তারই ছেলে তারেক রহমান। বাবার মতোই নিজে কোদাল দিয়ে কেটে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পোলো শার্ট, জিন্স, কেডস পরিহিত তারেক রহমানের মাথায় ছিল লাল-সবুজের ক্যাপ, যাতে লেখা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এর মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরের সাহাপাড়াসহ সারাদেশে ৫৪ জেলার খাল খনন-পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাহাপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই খালটির সঙ্গে পুনর্ভবা নদীর সংযোগ রয়েছে। সাহাপাড়া খালখনন কর্মসূচি উদ্বোধন উপলক্ষ্যে কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নে সমাবেশ হয়। প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচির উদ্বোধন করেই সেখানে স্থাপিত মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বলরামপুরের অনুষ্ঠানস্থলে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমবেত হতে শুরু করে। রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গ্রামবাসী বিশেষ করে নারীরা একনজর তারেক রহমানকে দেখতে উপস্থিত হন। খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, দিনাজপুরের সাংসদ মনজুরুল ইসলাম, সাদিক রিয়াজ, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম, উত্তরাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দা, বিএনপির জেলা সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি, কাহারোল থানার সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাদশা, সাধারণ সম্পাদক শামীম আলী।

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় ‘বেতনা নদী’ পুনর্খনন কাজ যখন উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান, তখন তিনি সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ‘জিয়া কেন জনপ্রিয়’ শীর্ষক একটি সংকলন গ্রন্থে এ কে এম সালেক তার প্রবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমানের এই কার্যক্রম শুরুর আগে দেশে ১০ শতাংশ জমিতে শুকনো মৌসুমে পানি সরবরাহ সম্ভব ছিল। খাল খনন কর্মসূচির পর অন্তত ৫২ লাখ একর জমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মাছ উৎপাদন, পানি নিষ্কাশন ও নৌ চলাচলে সহায়ক হয় ওই প্রকল্প। বৃদ্ধি পায় খাদ্য উৎপাদন। এখন নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, এ কর্মসূচি কৃষি ও সেচ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ভূ-উপরিস্থ পানির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির চাহিদা হ্রাস করাও এই খনন কার্যক্রমের লক্ষ্য। সরকার আশা করছে, এই কার্যক্রমের ফলে খরা প্রবণতা কমবে, অনদিকে বন্যা ও জলাবদ্ধতাও হ্রাস পাবে। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। পলি ও বালিতে ভরাট হয়ে বর্তমানে নৌপথ কমে হয়েছে চার হাজার কিলোমিটার। বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে বর্ষা মৌসুমে নৌপথ থাকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে নৌপথ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটারে। যা নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।

Leave a Reply