গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া খেলা-কলার ভোড়ের স্মৃতি আজ কেবল গল্পে
এক সময় ছিল, গ্রামবাংলার উঠোনজুড়ে হাসি-আনন্দে মুখর থাকত শিশু-কিশোরদের কলরব। বিকেলের শেষ রোদটা পড়ত মাঠের ধারে, আর সেই সময়ই শুরু হতো তাদের প্রিয় খেলা “কলার ভোড়”। আজ সেই খেলার দৃশ্য যেন শুধু স্মৃতির পাতায়, কিংবা বৃদ্ধদের মুখে গল্প হয়ে বেঁচে আছে। ঐতিহ্যের খেলা-কলার ভোড় নামটি যতই সরল শোনাক, এতে ছিল গ্রামের সৃজনশীলতা আর আনন্দের অনন্য প্রকাশ। কলার গাছের মোটা থোড় বা ভোড় কেটে নিত ছেলেরা। সেটির ওপর বসে শুরু হতো দৌড় প্রতিযোগিতা কিংবা ভেসে যাওয়ার খেলা। কখনও তা হতো ছোট নদীর পানিতে, কখনও বা পুকুরের জলে। ছোট ছোট হাতে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে “স্টিয়ারিং” বানিয়ে তারা বানাত ‘নৌকা’। কার ভোড় দ্রুত চলে, কারটা ভেসে থাকে বেশি সময়, এই নিয়েই জমে উঠত হাসির প্রতিযোগিতা। এই খেলাগুলো শুধু বিনোদন নয়, ছিল সামাজিক বন্ধনেরও মাধ্যম। বড়রা যেমন উৎসাহ দিতেন, তেমনি ছোটরাও শিখত একসাথে কাজ করতে, ভাগাভাগি করতে। গ্রামীণ জীবনের সরলতায় এই খেলার মধ্যেই ছিল শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক। কলার গাছ, পুকুর, নদী, মাঠ, সবই ছিল তাদের খেলার সাথী। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য-আজ গ্রামে গেলে দেখা যায়, পুকুরগুলো দেয়ালে ঘেরা, নদী শুকিয়ে গেছে, মাঠে উঠেছে ঘরবাড়ি। শিশুরা এখন ব্যস্ত মোবাইল গেমে, টিভির পর্দায়। কলার ভোড়ের সেই হাসির শব্দ হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম জানেই না, একসময় কলার ভোড় ছিল গ্রামীণ শৈশবের প্রাণ। বৃদ্ধদের চোখে আজও জল এসে যায়, যখন তারা বলেন, “আমরা কলার ভোড়ে চড়ে কত আনন্দ করতাম!” গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন এই হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোর পুনর্জাগরণ। স্থানীয় স্কুল বা সাংস্কৃতিক সংগঠন চাইলে গ্রামীণ উৎসব বা মেলায় এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা ফের তুলে আনতে পারে। কলার ভোড় শুধু একটি খেলা নয়, এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের নির্ভেজাল আনন্দ, শিশুদের হাসির উৎস এবং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মাধ্যম। আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য ফিরে পেলে, আমাদের গ্রামবাংলা আবারও হাসবে সেই পরিচিত, সরল, আনন্দমুখর শৈশবের হাসিতে।








