চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভেড়া পালন ॥ গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব বিপ্লব!
বাংলার গ্রাম আজ আর আগের মতো নেই। কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন এখন গ্রামীণ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক খাতে পরিণত হয়েছে। তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, ভেড়া পালন। একসময় পাহাড়ি কিংবা চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল এই প্রাণী, আজ তা বিস্তৃত হয়েছে দেশের নানা অঞ্চলে। সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে দেখা যায় দুধে-আলোয় ঝলমলে একটি ভেড়া নির্ভারভাবে ঘাস খাচ্ছে। দেখতে যতটা শান্ত, অর্থনীতিতে এর ভূমিকা ততটাই সম্ভাবনাময়। কারণ, ভেড়া পালন শুধু একটি পারিবারিক পেশাই নয়, এটি আজ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। গ্রামীণ আয়ের নতুন উৎস-ভেড়া পালন তুলনামূলক কম খরচে শুরু করা যায়। এক জোড়া ভেড়া কিনে যত্ন নিলে বছরে কয়েকটি বাচ্চা পাওয়া সম্ভব। ফলে অল্প সময়েই সংখ্যায় বাড়ে এবং তা বিক্রি করে কৃষক বাড়তি আয় করেন। স্থানীয় বাজারে একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ার দাম ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়, যা একজন ক্ষুদ্র কৃষকের পরিবারের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ভেড়ার চামড়া, পশম ও দুধ, সবই অর্থকরী।

ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি হয় উষ্ণ পোশাক ও হস্তশিল্পজাত পণ্য, যা শহরে বাজারে ভালো চাহিদা তৈরি করছে। ভেড়ার চামড়া থেকে তৈরি পণ্য রপ্তানিযোগ্য। এমনকি ভেড়ার দুধও পুষ্টিগুণে ভরপুর, যা বিদেশে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা হিসেবে গ্রামীণ নারীরা ঘরের আঙিনায় কয়েকটি ভেড়া পালন করে সংসারে অবদান রাখছেন। এতে একদিকে যেমন নারী ক্ষমতায়ন ঘটছে, অন্যদিকে পারিবারিক আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ছে। উপজেলা পর্যায়ের প্রাণিসম্পদ অফিসের সহায়তায় অনেকেই এখন সমবায় ভিত্তিতে ভেড়া পালন শুরু করেছেন। যদিও রোগব্যাধি, পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও সরকারের প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ভেড়া পালনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

ভেড়া পালন কেবল গ্রামীণ পেশা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই খাতের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সবুজ ঘাসে যখন ভেড়াগুলো ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে খেতে থাকে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক কোমল কিন্তু দৃঢ় প্রতীক গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব বিপ্লব।

Leave a Reply