‘প্যারালাইজড রোগীর জীবন বাঁচানোর লড়াই’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশনের কোণে এক চীনাবাদাম বিক্রেতার জীবনের গল্প
“জীবন যোদ্ধা আলী মোহাম্মদ এর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌরভার রহমতপাড়ায়। তিনি মৃত হেদাত আলীর ছেলে। এক ছেলে-দুই মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। নিত্য অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েই চলে এই বাদাম বিক্রেতার সংসার। মেলেনি কোন সরকারী সহায়তা, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী ভাতাও। কেউ শোনেনি এই অসহায় মানুষটির কষ্টের কথা। দূরারাগ্য ব্যধি প্যারালাইজড রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে যান প্রবীন এই বাদাম বিক্রেতা। তবে, হাল ছাড়েন নি, জীবন নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আজও।” চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন দেখা যায় এক পরিশ্রমী মানুষের নীরব সংগ্রাম। হাতে বাদামের বাটি, পাশে ছোট্ট ঝুড়ি, আর মুখে একটুখানি মলিন হাসি, এই দৃশ্য যেন বলে দেয়, ‘জীবন মানেই লড়াই’। এই বাদাম বিক্রেতার নাম আলী মোহাম্মদ। প্যারালাইজড রোগী হয়েও চালিয়ে যাচ্ছেন লড়াই। হার মানেন নি শত কস্টের মাঝেও। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি চীনাবাদাম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। জীবনের রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসেন রেলস্টেশনের কোণে। কিন্তু এক দশক আগে জীবনের এক কঠিন অধ্যায় শুরু হয়। হঠাৎ তিনি প্যারালাইজড হয়ে পড়েন,

শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ব্যবসা। তখন সংসারে নেমে আসে চরম দুঃসময়। অনেক কষ্টে সুস্থ হয়ে আবারও ফিরে আসেন নিজের পুরনো জায়গায়, রেলস্টেশনে বাদাম বিক্রিতে। এখনো প্রতিদিনের মতো ট্রেনের সিটি বাজলে তিনি বলেন, ‘বাদাম নেন ভাই, গরম গরম বাদাম!’ এই ডাকে লুকিয়ে আছে তাঁর বেঁচে থাকার সাহস, জীবনের জেদ। অভাবের সংসারে অবিচল মানুষটি, তাঁর সংসারে আছেন এক ছেলে ও দুই মেয়ে। জীবনের কষ্টের মধ্যেও এক ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন নিজের উপার্জিত কস্টের টাকায়। বাকি মেয়েটিও লেখাপড়া করছে তাঁর কষ্টের টাকায়। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘এত বছর বাদাম বিক্রি করছি, অথচ বয়স্ক ভাতা বা প্রতিবন্ধী ভাতা কেউ দেয়নি। অভাবে দিন কাটাই, কিন্তু কাজ বন্ধ করিনি।’ তাঁর মুখের সেই ক্লান্ত অথচ দৃঢ় হাসি যেন সমাজের কাছে এক বার্তা, মানুষ যত কষ্টেই থাকুক, সম্মানজনক জীবনের জন্য পরিশ্রমের বিকল্প নেই। বয়স, অসুস্থতা, অভাব-কিছুই তাঁকে হার মানাতে পারেনি। জীবন এখনও চলছে বাদামের গন্ধে আর ঘামের দামে। মানবিক দৃষ্টির আহ্বান-রেলস্টেশনের যাত্রীদের কাছে তিনি হয়তো এক সাধারণ বিক্রেতা। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্প আমাদের সমাজের অবহেলিত প্রান্তের বাস্তবতা তুলে ধরে। একজন পরিশ্রমী, অসুস্থ, অথচ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ এখনো সরকারি কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না-এ এক নির্মম এবং নিষ্ঠুর সত্য। সমাজের সচেতন মানুষ ও প্রশাসনের দৃষ্টি যদি তাঁর দিকে পড়ে, তবে হয়তো এই প্রবীণ বাদাম বিক্রেতার জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।

Leave a Reply