চাঁপাইনবাবগঞ্জে আখ চাষ: অতীতের বৈভব, বর্তমান সংকট ও উত্তরণ পথ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ঐতিহাসিকভাবে আখ চাষ ও গুড়-চিনি প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনে পরিচিত ছিল। আখ চাষ ও গুড় তৈরি ছিল গ্রামের কৃষক-শ্রমজীবীদের উপার্জনের একটি প্রধান উৎস। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে এই চক্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক কৃষক আখ চাষ থেকে সরে গেলেও, কিছু অঞ্চল এখনও চেষ্টায় রয়েছে। একসময় এই জেলার শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও নাচোল এলাকায় আখের সুবাসে মুখর থাকত গ্রাম। গুড়ের হাঁড়িতে ফুটত আখের রস। শীত মৌসুম এলেই গ্রামেগঞ্জে গুড়ের গন্ধে মাতোয়ারা থাকত মানুষ। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কৃষকরা লাভজনক ফসল যেমন মরিচ, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির দিকে ঝুঁকছেন। আখ চাষে সময় বেশি লাগে, শ্রমও বেশি — অথচ বাজারদর অনিশ্চিত।

ফলে কৃষকরা ধীরে ধীরে আখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। হ্রাসের প্রধান কারণ: ১. চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়া ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাব। ২. উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কম লাভজনকতা। ৩. ভেজাল গুড়ের দৌরাত্ম্য ও বাজারে আস্থা হারানো। ৪. আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের আখ ব্যবহারে অনীহা। ৫. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উৎপাদন ক্ষতি। কৃষকের অভিমত: স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে আখ থেকে রস কম পাওয়া যায় এবং গুড় ঠিকমতো জমাট বাঁধে না। এর পাশাপাশি, বাজারে ভেজাল গুড় বিক্রির কারণে আসল কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রশাসনিক তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক প্রশিক্ষণ ও বীজ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা। সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ: চিনিকল পুনরায় চালু ও আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। উন্নত জাতের আখ বীজ সরবরাহ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিতে হবে। কৃষক প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। ভেজাল গুড় নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আখ চাষে সরকারি প্রণোদনা ও স্বল্প সুদের ঋণ প্রদান করলে কৃষকরা আবার আগ্রহী হতে পারেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আখ চাষ একসময় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অংশ ছিল। আজ তা বিলুপ্তপ্রায়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই আখ চাষ আবারও ফিরতে পারে। তখন হয়তো আবারও শীতের সকালে ভেসে আসবে গুড়ের মিষ্টি গন্ধ- যা একসময় এই জেলার গর্ব ছিল।

Leave a Reply