হাতের খেলনা নয়-হাতে কাজ ॥ চাঁপাইনবাবগঞ্জে শৈশব গিলে খাচ্ছে শিশু শ্রম

হাতের খেলনা নয়-হাতে কাজ ॥ চাঁপাইনবাবগঞ্জে শৈশব গিলে খাচ্ছে শিশু শ্রম

সবুজ রঙের দেয়ালঘেরা ছোট্ট এক চায়ের দোকান। কেটলি থেকে ভাপ উঠছে, সারি সারি কাপে ঢালা হচ্ছে চা। দোকানের ভেতরে ব্যস্ত হাতে কাজ করছে একটি শিশু-মাথায় শীতের টুপি, চোখে ক্লান্তির ছাপ। বয়স দশ কি এগারো পেরোয়নি। ছবি বলছে, এ শুধু একটি শিশুর গল্প নয়; এ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ক্রমবর্ধমান শিশু শ্রমের নীরব দলিল। এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়। জেলার সদর থেকে গোমস্তাপুর, নাচোল কিংবা শিবগঞ্জ চা-দোকান, হোটেল, ইটভাটা, গ্যারেজ, খুচরা দোকান এমনকি কৃষিকাজেও শিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

অভিভাবকের দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া-সব মিলিয়ে শিশুরা বাধ্য হচ্ছে সময়ের আগেই “কর্মজীবনে” প্রবেশ করতে। ছবির শিশুটি জানে না তার কাজটি আইনত অপরাধের শামিল। তার কাছে কাজ মানে-পরিবারের জন্য দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত করা। স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি নয়, তার দিনের শুরু কেটলির সিটির শব্দে। বন্ধুরা যখন বইখাতা হাতে স্কুলে যায়, তখন সে গুনে গুনে কাপ ধোয়, চা ঢালে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক শিশু করোনাপরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে স্থায়ীভাবে কাজের জগতে ঢুকে পড়েছে। বিদ্যালয়ে ফিরতে চাইলেও দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতা তাদের পিছু ছাড়ছে না। বাংলাদেশে শিশু শ্রম নিরোধে আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ দুর্বল। জেলা পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি-এসবের অভাব স্পষ্ট। ফলে শিশু শ্রম যেন ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” হয়ে উঠছে। সমাজের দায় এই শিশুর চোখে যে প্রশ্ন-“আমি কি শুধু কাজই করব?”-তার উত্তর খোঁজার দায়িত্ব আমাদের সবার। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং সর্বোপরি সমাজকে একসঙ্গে এগোতে হবে। দরকার পরিবারভিত্তিক সহায়তা, স্কুলে ফেরানোর উদ্যোগ, এবং শিশুশ্রমমুক্ত কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা। ছবির ফ্রেমে ধরা পড়া শিশুটি আমাদের আয়না। আজ যদি আমরা মুখ ফিরিয়ে নেই, আগামী দিনে এই জেলাই হারাবে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ-শিশুদের।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *