বাবুডাইং আলোর পাঠশালার একুশ উদযাপন ॥ বাঁশ-কঞ্চির মিনারে ফুলের শ্রদ্ধা
বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটি। চারদিকে রুক্ষ প্রকৃতি আর ধুলোবালি। কিন্তু সেই ধুলোমাখা পথেই আজ ফুটে উঠেছে এক অন্যরকম দেশপ্রেমের ছবি। যেখানে দামী মার্বেল পাথর বা ইট-সিমেন্টের কোনো স্থায়ী কাঠামো নেই, সেখানে বাঁশ আর কঞ্চির বাঁধনেই মিশে আছে একুশের চেতনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার বাবুডাইং আলোর পাঠশালার শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে গড়া অস্থায়ী শহিদ মিনারে বুনো ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে স্মরণ করেছে ভাষা শহিদদের। বিদ্যালয়টিতে কোনো স্থায়ী শহিদ মিনার নেই। তাহলেও দমে যায়নি শিক্ষার্থীরা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে চলে তাদের কর্মযজ্ঞ। বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা নিজেরাই জঙ্গল থেকে বাঁশ কেটে এনেছে, কঞ্চি চেঁছেছে এবং কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি করেছে মিনারের বেদি।

শুধু মিনার তৈরিই নয়, সেই মিনারের গায়ে নিপুণ হাতে আঁকা হয়েছে আল্পনা। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। বেলা ১১টার দিকে বিদ্যালয় থেকে বের করা হয় একটি বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরি। বরেন্দ্র অঞ্চলের আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে শোভাযাত্রাটি পুনরায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এরপর শুরু হয় পুষ্পস্তবক অর্পণ। প্রথমে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে শিক্ষার্থীরা তাদের সংগৃহীত বুনো ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেয় বাঁশ-কঞ্চির সেই মিনার। শহরের নামী সব ফুলের দোকান থেকে কেনা দামী গোলাপ বা রজনীগন্ধা নয়, বরং পাশের বন-জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা বুনো ফুলের সুবাসেই আজ সুবাসিত ছিল বাবুডাইংয়ের এই অস্থায়ী মিনার। সুরমিরা হাসদা এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের স্কুলে শহীদ মিনার নেই, তাই আমরা বন্ধুরা মিলে এটি বানিয়েছি। আমরা চাই আমাদের স্কুলে একটি বড় শহীদ মিনার হোক, কিন্তু এখন এটি বানিয়ে ফুল দিতে পেরেও আমাদের অনেক আনন্দ হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলীউজ্জামান বলেন, ২০০৭ সাল থেকে আমরা নিয়মিতভাবে এখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছি। স্থায়ী মিনার না থাকলেও শিক্ষার্থীদের স্বতস্ফূর্ততা আমাদের মুগ্ধ করে। তারা নিজেরাই কঞ্চি কেটে মিনার তৈরি করে এবং আল্পনা আঁকে। এতে করে তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ভাষার প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হচ্ছে। বাবুডাইং আলোর পাঠশালার সভাপতি শফিকুল আলম ভোতা বলেন, শহরের চাকচিক্য এখানে নেই, কিন্তু ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। এই শিক্ষার্থীরা শিখিয়ে দিচ্ছে, ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে কেবল একটি স্বচ্ছ হৃদয় আর একমুঠো বুনো ফুলই যথেষ্ট। বাবুডাইং আলোর পাঠশালার এই আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, একুশের চেতনা কেবল শহরের দামী সৌধের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। বরেন্দ্রর লাল মাটিতে নিজেদের হাতে গড়া এই অস্থায়ী মিনারে যে মমতা আর গভীর শ্রদ্ধাবোধ মিশে ছিল।

Leave a Reply