পুনর্ভবা-মহানন্দার মোহনা ॥ মকরমপুর ঘাটে সম্ভাবনা ও সংকটের চিত্র
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর অঞ্চলে অবস্থিত মকরমপুর ঘাট, যেখানে মিলেছে পুনর্ভবা নদী ও মহানন্দা নদী। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক সংযোগস্থল নয়, এটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এই মোহনায় প্রতিদিন পারাপার করেন কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি।যোগাযোগের নাজুক সেতুবন্ধন-মকরমপুর ঘাটে পারাপারের প্রধান ভরসা একটি বাঁশের সাঁকো। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বর্ষায় স্রোত বেড়ে গেলে এই সাঁকো ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর চর জেগে উঠলে চলাচল হয় আরও অনিশ্চিত। জরুরি চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত, সবই নির্ভর করে একটি অস্থায়ী কাঠামোর ওপর।জনস্বার্থের প্রশ্ন-এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগস্থলে স্থায়ী সেতু বা আধুনিক ঘাট কেন এখনো বাস্তবায়িত হলো না?
দু’নদীর মিলনস্থল হওয়ায় এখানে মাছের প্রাচুর্য তুলনামূলক বেশি। স্থানীয় জেলেরা জানান, বর্ষা মৌসুমে দেশি প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়ে। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলে সবজি ও মৌসুমি ফসলের আবাদ হয়। নৌকা, ছোটখাটো বাজার, পারাপারভিত্তিক আয়, সব মিলিয়ে ঘাটকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।তবে নৌযান চলাচলের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি-ঘাটসংলগ্ন এলাকায় বর্জ্য ফেলা ও অপরিকল্পিত বসতি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদীতীরে প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের স্তুপ পানিদূষণ বাড়ায়, যা মাছ ও জীববৈচিত্রের জন্য চরম ক্ষতিকর। একই সঙ্গে দূষিত পানি ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, নদীভাঙনও একটি বড় উদ্বেগ। মহানন্দার স্রোত পরিবর্তিত হলে তীর ক্ষয় হয়, বসতভিটা ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়ে।সীমান্ত ও কৌশলগত গুরুত-পুনর্ভবা ও মহানন্দা উভয়ই আন্তঃসীমান্ত নদী। উজানে পানি প্রবাহ, পলি জমা ও বর্ষাকালের অতিরিক্ত স্রোত, সবকিছুই স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সমন্বয়, ড্রেজিং পরিকল্পনা ও তথ্যভিত্তিক নজরদারি জরুরি।
জনস্বার্থে সমন্বিত উদ্যোগ-১. স্থায়ী সেতু বা আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ—স্থানীয় অর্থনীতি ও নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে।২. আধুনিক ঘাট ও নৌযান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা—লাইফ জ্যাকেট, নির্ধারিত পারাপার সময়সূচি ও তদারকি।৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা কর্মসূচি, নদীদূষণ রোধে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ।৪. নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প, ভাঙনরোধে জিওব্যাগ/ব্লক স্থাপন ও প্রয়োজনে ড্রেজিং।
৫. ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা যাচাই, নদীমোহনাকে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক করে তোলা গেলে স্থানীয় আয় বাড়তে পারে।মকরমপুর ঘাটে পুনর্ভবা-মহানন্দার মিলন এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে আছে মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম। জনস্বার্থের বিচারে এটি কেবল একটি ঘাট নয়, এটি উন্নয়ন-অবহেলা ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণ। পরিকল্পিত অবকাঠামো, পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ একসাথে কার্যকর হলে মকরমপুর ঘাট উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের এক মডেল হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply