ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ইলামিত্র প্রাইমারী স্কুল
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাসকারীদে গ্রাম কার্ত্তিকপুর, ধরলশ্যামপুর, ধরইল, জমিন-কমিন, নতুনপাড়া ও বাসুগ্রাম। এসব গ্রাম থেকে সবচেয়ে কাছের বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। তেমন সুবিধাজনক ব্যবস্থা না থাকায় প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়তো শিক্ষার্থীরা। ছাত্রীদের বিয়েও দিয়ে দিতেন অভিভাবকরা। অনেক অভিভাবক সন্তানদের আত্বীয়-স্বজন ও মিশনে পাঠিয়ে পড়াশোনা করাতেন। ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্রের তেভাগা আন্দোলনের ঘাঁটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের ছয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গ্রামে কোন বিদ্যালয় না থাকায় অবশেষে সেখানে প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে খুশি ৬টি গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষরা। বাসুগ্রামে ইলামিত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় খুশি এই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীরা।
বাসুগ্রামের কলেজ পড়ুয়া সোনিয়া টুডু বলেন, আমি এখন রাজশাহীতে পড়াশোনা করি। প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ার সুযোগ না থাকার কারনে বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে পারিনি। যেতে হয়েছে আত্বীয়-স্বজনদের বাড়িতে। সেখান থেকে স্কুল পড়েছি। আমার মতো অনেকেই নিজ বাড়ি ছেড়ে দূরে গিয়ে স্বজনদের বাসায় পড়াশোনা করেছে। সবার জন্য এমন সুযোগ না থাকায় এখানকার বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারতো না। গৃহবধূ কিসকু মুরমু জানান, আমার মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি মাত্র ১৪ বছর বয়সে। এখান থেকে স্কুল যেতে হতো প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ দূরে। এতোদূরের স্কুলে পাঠানো ঝুঁকি মনে করেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। আমার মতো অনেক অভিভাবকই তাদের মেয়েকে প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে পড়ার সময়ই বিয়ে দিয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় সঞ্জয় বলেন, স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে মেয়েদেরকে বাল্যবিয়ে ও ছেলেদেরকে বিভিন্ন কাজে লাগাতেন অভিভাবকরা। এছাড়াও এখানকার সড়কে বর্ষার সময়ে হাঁটুভর্তি কাদা ও অন্যান্য সময়ে ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ থাকে। ফলে ৭ কিলোমিটার দূরে দিয়ে শিক্ষা নেয়া প্রতিদিনের যুদ্ধের ন্যায় শিক্ষার্থীদের কাছে। ইলা মিত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়াতে আমরা ভীষণ খুশি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নেতা বিধান সিং জানান, এই ছয় গ্রামে কোন বিদ্যালয় ছিল না। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে অন্ধকারে থাকা এসব গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছেছে। এর আগে এসব গ্রামের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত ছিল। সরকারের এমন চমৎকার উদ্যোগের ফলে এসব গ্রামের শিশুরা এখন থেকে সকলেই প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আসতে পারবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জেহের আলী জানান, আগামী বছরের জানুয়ারী থেকেই শুরু হবে পাঠদান। এ লক্ষ্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানানো হয়েছে। নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাইমেনা শারমীন জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এসব গ্রামেই কৃষকদের পক্ষে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গড়ে তুলেছেন ইলা মিত্র। তাই তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নামেই করা হয়েছে বিদ্যালয়ের নাম। এর পাশাপাশি ইলা মিত্রের বিভিন্ন ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য একটি সংগ্রহশালাও নির্মাণ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৯ নভেম্বর ইলামিত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবণ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়ের ভবণ নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
Leave a Reply