চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বাজারে নৈরাজ্য ॥ আড়ৎদার-চাষীর পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বাজারে নৈরাজ্য ॥ আড়ৎদার-চাষীর পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

গত ৫ জুন বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আমের ওজন জটিলতা ও কমিশন নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাবার পর বুধবার (১১ জুন) দিনব্যাপি আবারো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আড়ৎদারদের দরকষাকষির পর বিকেলে সর্বসম্মতিক্রমে ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কেনাবেচা এবং কেজি প্রতি দেড় টাকা কমিশন দেয়ার মাধ্যমে বৃহষ্পতিবার (১২ জুন) থেকে রাজশাহী বিভাগের সব বাজারে আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত হয়। রাজশাহীর বানেশ^র, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও রহনপুর এবং নওগাঁর সাপাহারের আম আড়ৎদার সমিতির নেতারা, আমচাষী, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন উপজেলার উপজেলা নির্বার্হী অফিসার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত হয়। সভার সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে মাইকে প্রচার করে সে মোতাবেক সবাইকে আম কেনা-বেচার আহবানও জানানো হয়। কিন্তু বৃহষ্পতিবার বাজার পরিস্থিতি ছিল ঠিক উল্টো। রাজশাহীতে সিদ্ধান্ত সব পক্ষ মেনে নিলেও চাষী-ব্যবসায়ী ও আড়ৎদার একে অপরকে দায়ী করছেন। ওজনের নামে কোন আম নেয়ার কথা না থাকলেও চাষীদের অভিযোগ প্রতিবার ওজনের সময় একটি করে আম (শলা) নেয়া হচ্ছে। কেজি প্রতি দেড় টাকা কমিশন নেয়ার পরও ৪০ কেজির বেশি আম চাওয়া হচ্ছে। অন্যথায় একটি ভ্যানের ৪টি ডালির মধ্যে ২ ডালির আম বেছে উচ্ছিস্ট করে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এদিকে, বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বাজার মনিটরিং টিম মাঠে থাকার কথা থাকলেও কাউকে চোখে পড়েনি আমবাজারগুলোতে। অন্যদিকে, অনিয়ম বা হয়রানি হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনকে জানানোর আহবান জানানো হলেও কেউ অভিযোগও জানাতে যায়নি। কানসাট বিশ^নাথপুর গ্রামের আমচাষী মিজানুর রহমান সকাল সাড়ে ৭ টায় কানসাট আম বাজারে ১২ ভ্যানে ২’শ মণ আম নিয়ে আসেন। ২ ঘন্টা ধরে বসে থাকলেও কোন ক্রেতা ছিলোনা। এতগুলো আম নিয়ে বেকায়দায় পড়ে। ২ ঘন্টা পর একজন বেপারী আসলেও দাম বলছেন গতকালের থেকে মণে ৫’শ টাকা কম। আবার ৫২ কেজিতে মণ ধরে আম নিতে চাচ্ছেন। বুধবার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের নতুন নিয়মের কথা বলতেই সে বেপারী রেগে চলে যায়।

ক্ষোভের সাথে মিজান এ প্রতিবেদককে জানান, আমের ভরপুর সময়ে এ ধরনের নাটক জেলার আমকে ধ্বংস করার জন্য একটি গ্রুপ উঠে-পড়ে লেগেছে। এ আম এখন চাষীর গলার কাঁটা। তিনি উল্টো প্রস্তাব দেন এসব নিয়ে নাটক বাদ দিয়ে ১০ বছর আগে যেভাবে ৪৫ কেজিতে মণ ধরে আম বিক্রি হতো সেটায় চালু হওয়া দরকার। যত এ নিয়ে চাপাচাপি হবে, ততই চাষী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কানসাটের অপর চাষী মনিরুল ইসলামও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, একদিকে ওজন জটিলতা নিয়ে ইদুর বিড়াল খেলা, অন্যদিকে আমের সরবরাহ বাজারে বেশি হওয়ায় দাম কম। তাই বাধ্য হয়ে যে দামই হোক, আম বিক্রি করতেই হবে। এ অবস্থা শুধু এ ২ চাষীর নয়, কানসাটে অবস্থান করা প্রায় ৩’শ চাষী সহ পুরো জেলার বিভিন্ন বাজারের। এদিকে, জেলার বিভিন্ন বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আড়ৎদারগণ যে যার মত ভাবে আম কিনছেন। আমচাষীরাও অনেকটা জিম্মি হয়ে আম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভোলাহাট আমবাজারে ৫২ কেজিতে মণ ধরে আম কেনা-বেচা হয়েছে। গোমস্তাপুরের রহনপুর আমবাজারে ৫০-৫২ কেজিতে মণ ধরে আম কেনা-বেচা হয়েছে। দেশের বৃহত্তম কানসাট আমবাজারে ৫২ কেজিতে মণ ধরে কেজি দরে আম কেনা হচ্ছে এবং ৫২ কেজির জায়গায় ৪০ কেজির হিসেবে ৬০ টাকা কমিশন নেয়া হচ্ছে। বুধবার এ বাজারে ১০ টাকা কমে খিরসাপাত ৪০থেকে ৫০ টাকা কেজি, লক্ষনভোগ ৩ টাকা কমে ১২ থেকে ১৭ টাকা, গুঠি জাতীয় ১০টাকা থেকে ১৫টাকা কেজি দরে কেউ কেউ কিনেছেন। তবে বেশিরভাগ আড়ৎদার ৫২ কেজিতে মণ ধরে খিরসাপাত ২৪০০/২৮০০ টাকা , ল্যাংড়া আম ২০০০/২২০০টাকা, লখনা আম ৮০০/১০০০ টাকা দরে কেনাবেচা করেছেন। দীর্ঘদিনের পুরাতন নিয়ম বাদ দিয়ে নতুনভাবে আম কেনা-বেচায় সময় প্রয়োজন দাবী করে আম চাষীদের গোমস্তাপুর উপজেলার আম ব্যবসায়ী ও আমচাষী সমিতির সাধারন সম্পাদক আবু তালেব জানান, চাষীদের প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক আমের কোয়ালিটি ভেদে ৩ টি শ্রেণীতে ভাগ করতে হবে এবং ৩ ভাবে বিক্রি করার মানষিকতা থাকতে হবে। গড় ওজন করে দাম করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর চাষী-আড়ৎদার সবাইকে উদারভাবে একে অপরের সহযোগী মনে করে ব্যবসা করতে হবে। নয়ত এর সুফল মিলবেনা।
গোমস্তাপুর উপজেলা আম আড়ৎদার সমিতির সাধারন সম্পাদক নাসির উদ্দিন দাবী করেন, সরকারের দেয়া নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারলে করবেন, নয়ত ব্যবসা গুটিয়ে নিবেন।কারন আড়ৎঘরের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীর বিল সহ যে খরচ রয়েছে তা এ নিয়মে উঠানো কঠিন। তাছাড়া ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কিনে ঢাকার পাটির কাছে আম পৌছানোর পর ৩৫ কেজি হলে ৫ কেজি আম কে দিবে? এতে করে উত্তরবঙ্গ থেকে সব ক্রেতা দক্ষিণ বঙ্গে চলে যাবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে কৃষক।
রাজশাহী বিভাগের আড়ৎদার সমিতির আহবায়ক ও কানসাট আড়ৎদার সমিতির সভাপতি আবু তালেবের ভাষ্য, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে তারা সব সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও উল্টো চাষীরায় এখন সে নিয়ম মানতে চাইছেনা। যা দু:খজনক। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বার্হী অফিসার আজাহার আলী জানান, ৪০ কেজিতেই মণ এবং কেজি প্রতি দেড় টাকা কমিশনের বাইরে কোন আর বাড়তি চার্জ বা অতিরিক্ত আম নেয়ার বিধান নেই। সিদ্ধান্তগুলো সার্বজনীনভাবে সব জেলায় কার্যকর হবে, যাতে বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও সুষ্ঠু বাণিজ্য পরিবেশ বজায় থাকে। আর এর জন্য বাজার অবশ্যই নজরদারী করা হবে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *