কাকের রাজত্ব সেই তেঁতুল গাছে ॥ রহনপুর রেলস্টেশনের বিকেলের অদ্ভুত সঙ্গ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশন-একটা নাম, যেখানে সময় যেন থমকে থাকে বিকেলের ছায়ায়। স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন তেঁতুল গাছ, বয়স হয়তো শত বছর ছুঁইছুঁই। পাতা ঘন, ডালপালা জটলার মতো ছড়িয়ে আছে চারদিকে, যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। কিন্তু বিকেল নামলেই বদলে যায় এই গাছের রূপ। যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখন হঠাৎ করেই গাছটির উপর নেমে আসে এক ভিন্ন জগৎ, শত শত কাকের রাজত্ব। কালো ডানার ফড়ফড় শব্দে ভরে ওঠে রহনপুর স্টেশনের আকাশ। তাদের কা-কা ডাক যেন এক বিশেষ ছন্দে মিশে যায় বিকেলের নিস্তব্ধতায়। রেলস্টেশনের ব্যস্ততা, লোকজনের হাঁটাচলা, ট্রেনের হুইসেল—সবকিছুর মাঝেও কাকদের এই সমাবেশ এক ধরনের মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। মনে হয়, এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো বৈঠকখানা—যেখানে দিনের সব গল্প, ক্ষোভ, আনন্দ আর যন্ত্রণা তারা মিলে ভাগাভাগি করে নেয়। স্থানীয়রা বলেন, “এই গাছটা বহুদিনের পুরনো। যতদূর মনে পড়ে,

বিকেলে কাকেরা সব সময়ই এখানে আসে। একদিনও বাদ দেয় না। মাগরিবের সময় যখন অন্ধকার নামে, তখন তারা একে একে মিলিয়ে যায় আকাশে।” গাছটির নিচে দাঁড়ালে যেন বোঝা যায়, এই গাছ শুধু কাকের আশ্রয় নয়—এটি রহনপুরের সময়, ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সঙ্গীতের এক জীবন্ত প্রতীক। বিকেলের আলোয় যখন তেঁতুল পাতায় লেগে থাকা সূর্যরশ্মি কাকের কালো পালকে ঝিলিক তোলে, তখন মনে হয়—এ দৃশ্য যেন এক জীবন্ত কবিতা। গাছের নিচে বসে থাকে পথচলতি মানুষ, চায়ের দোকানের ধোঁয়া উড়ে যায় বাতাসে। কেউ ট্রেনের অপেক্ষায়, কেউ বা কেবল সময় কাটাতে এসেছে। কিন্তু গাছের ওপর চলতে থাকে কাকদের বিশাল সংসার—তাদের ডাক, উড়াল, ঝগড়া, মিলন—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক স্বপ্নময় দৃশ্যপট। প্রতিদিন বিকেল থেকে মাগরিব পর্যন্ত এই তেঁতুল গাছের ডালে ডালে ভর করে রহনপুরের আকাশ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। কাকেরা ফিরে যায় যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে, গাছটি তখন আবার নীরব হয়—তবু থেকে যায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি, এক অচিন নস্টালজিয়া। রহনপুরের এই শতবর্ষী তেঁতুল গাছ তাই শুধু প্রকৃতির অংশ নয়—এটি এক নীরব মহাকাব্য, যেখানে প্রতিদিন লেখা হয় কাকের, আলো-ছায়ার আর সময়ের এক অনন্ত গল্প।

Leave a Reply