গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সজনে ডাটা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের গাছে গাছে ফুল ॥ উৎপাদন ৩ হাজার টন

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সজনে ডাটা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের গাছে গাছে ফুল ॥ উৎপাদন ৩ হাজার টন

বাংলার গ্রামীণ জনপদে ঋতু বদলের এক নীরব বার্তা নিয়ে ফোটে সজনে গাছের সাদা-হলদে ফুল। উঠোনের পাশে, খেতের ধারে কিংবা গ্রামের মেঠোপথে দাঁড়িয়ে থাকা সজনে গাছ শুধু নান্দনিকতার প্রতীক নয়, এটি পুষ্টি, ভেষজ গুণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক নির্ভরযোগ্য ভরসা। উত্তর-পশ্চিমের জনপদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-এ সজনে ডাটার গাছে ফুল ফোটা মানেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়া। জেলায় প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন সজনে ডাটা উৎপাদনের আশা বিশেষজ্ঞদের। সজনে (Moringa oleifera) “মিরাকল ট্রি” নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর ডাটা, পাতা ও ফুল, সবই খাদ্যোপযোগী এবং ভিটামিন-সমৃদ্ধ। সজনের পাতায় ভিটামিন অ, ঈ, ক্যালসিয়াম ও আয়রন প্রচুর পরিমাণে থাকে; ডাটায় রয়েছে উচ্চমাত্রার ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা হজমশক্তি বাড়ায় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে। স্থানীয় পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত সজনে খেলে অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে—যা গ্রামীণ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদন ও বিস্তার-আমের জন্য বিখ্যাত এই জেলায় গত এক দশকে সজনে চাষেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, জেলায় আনুমানিক ৮-১০ হাজারের বেশি সজনে গাছ রয়েছে,

যার বড় অংশই পারিবারিক আঙিনা ও মিশ্র বাগানে। মৌসুমভেদে প্রতিটি পরিণত গাছ থেকে গড়ে ২৫-৪০ কেজি ডাটা পাওয়া যায়। সে হিসাবে বছরে জেলায় প্রায় ২,০০০-৩,০০০ মেট্রিক টন সজনে ডাটা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলায় এর বিস্তার তুলনামূলক বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান-সজনে একটি স্বল্প খরচের, কম পরিচর্যার ফসল। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম। স্থানীয় হাট-বাজারে মৌসুমে প্রতি কেজি ডাটার দাম ৬০-১০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে। ফলে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারের জন্য সজনে হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের উৎস। নারীরা বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগিয়ে ডাটা, পাতা ও ফুল বিক্রি করে পারিবারিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছেন। ভেষজ ও পরিবেশগত গুরুত্ব-লোকজ চিকিৎসায় সজনে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ কমানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে গ্রামীণ চিকিৎসকেরা মনে করেন। পরিবেশগত দিক থেকেও সজনে গুরুত্বপূর্ণ; দ্রুতবর্ধনশীল এ গাছ মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে ও কার্বন শোষণে সহায়তা করে, খরা-সহনশীল হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতেও টিকে থাকে। তবে সম্ভাবনা সত্ত্বেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সজনে চাষ এখনো বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মানসম্মত চারা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি, কৃষক প্রশিক্ষণের অভাব—এগুলো বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে উন্নত জাতের চারা বিতরণ, চাষাবাদে প্রশিক্ষণ এবং সংগ্রহ-সংরক্ষণ ও ভ্যালু-চেইন উন্নয়ন করা গেলে সজনে হতে পারে জেলার নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। গ্রাম বাংলার চিরচেনা সজনে গাছের ফুল ফোটা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি পুষ্টি নিরাপত্তা, ভেষজ উপকারিতা ও গ্রামীণ জীবিকার এক টেকসই প্রতীক। আমের জনপদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে সজনের এই নীরব বিপ্লবকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে, কৃষি-বৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন গতি, ফুটে উঠবে সম্ভাবনার সাদা-হলুদ ফুল।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *