ঘোষণা খাতা-কলমে-বাস্তবায়ন নেই ॥ দেদারসে চলছে বাল্যবিবাহ
শিবগঞ্জ উপজেলাকে দ্বিতীয়বার বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা নিয়ে নানা সমালোচনা
ঘটা করে এবং অনেক অর্থ ব্যয় করে এর আগেও শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঘোষণা ছিল-খাতা কলমে। বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি। দেদারসে চলেছে পুরো উপজেলা জুড়ে বাল্য বিয়ে। বাল্যবিয়ের তালিকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দেশের মধ্যে কয়েক জেলার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানে। বাল্যবিয়েতে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে ছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বাল্য বিয়ে হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। বিষয়টিকে অতি উৎসাহী এবং উদ্যেশ্যপ্রণোদিত বলছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিকাহ রেজিষ্টার সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুল বারী। এর আগে শিবগঞ্জ উপজেলাকে ২০১৭ সালে লোক দেখানো আর বাহ্বা নেয়ার জন্য শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করার জন্য সরকারী কোষাগারের অনেক টাকা অপচয় করা হয়েছে। তখনও তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার খুব গর্বভরেই শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্য বিয়ে মুক্ত ঘোঘণা করেছিলেন। কিন্তু ঘোষণা করেই শেষ। প্রশাসনের এমন কাজকে উপজেলাবাসী ভালোভাবে না নিলেও ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও আওয়ামী সরকার দলীয় লোকজনের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে নি। বর্তমানে আবারও একই রকম কাজ, আবারও শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিয়েমুক্ত ঘোষণা করায় নানা গুঞ্জন ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের দাবী যে বিষয় যতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব, ততকুটুই প্রচারণা বা ঘোষণা করা উচিৎ। ঘোষনা যদি খাতা-কলমেই থাকে, সেটা সাধারণ মানুষের সাথে তামাশা করা ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া বর্তমান সময়েও যদি এমন কাজ বা ঘোষণা আসে, তাহলে সেটা আরও দুঃখের বিষয়। প্রশাসনের কাছে সাধারন মানুষের চাওয়া-পাওয়া সঠিক অঙ্গীকার।
একটি তথ্যে জানা গেছে, সারাদেশের মধ্যে বাল্যবিয়েতে শীর্ষস্থানে অবস্থানে পিরোজপুর জেলা, আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ‘বর্ন টু বি অ্যা ব্রাইড, চাইল্ড ম্যারেজ: ট্রেন্ডস অ্যান্ড কজেস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, দেশে সবচেয়ে বেশি বাল্য বিয়ে হয় পিরোজপুর জেলায়। এ জেলার বাল্যবিয়ের হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয়তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ জেলায় বাল্যবিয়ের হার ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ। বাল্যবিয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তার অভাবকে। এছাড়াও দারিদ্রতা, ‘ভালো পাত্রের সন্ধান’, লেখাপড়ায় অনীহার কারণে বাল্যবিয়ের চর্চা বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলাকে দ্বিতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গত বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজাহার আলী। “আমার উপজেলা, আমার দায়িত্ব-শিশুর জীবন হোক বাল্যবিবাহমুক্ত” এ স্লোগানকে সামনে রেখে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়ার চেঞ্জ প্রকল্পের উদ্যোগে এই বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এর আগে শিবগঞ্জ উপজেলাকে ২০১৭ সালে প্রয়াত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছিলেন। সে-সময় উপজেলা স্টেডিয়ামে ঢাকঢোল বাজিয়ে জমকালো আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী শিল্পী অপু বিশ্বাস, সংগীত শিল্পি ইন্দ্রকেশর ও মমতাজ। তবে স্থানীয়দের এলাকাবাসীর অভিযোগ ওই ঘোষণার পর এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেড়ে যায়, যা এখনো বিদ্যামান। শিবগঞ্জের স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি আব্দুল খালেক বলেন, বাল্যবিবাহমুক্ত উপজেলা ঘোষণা মানে এই নয় যে, বাল্যবিবাহ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বাস্তবে এখনো রাতের অন্ধকারে অনেক বিয়ে হচ্ছে। সচেতনতা না বাড়ালে এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করলে, এ প্রবণতা কমানো সম্ভব নয়। সচেতন মহলের অভিমতও প্রায় একই। কোন জোরালো অভিযান না চালিয়ে কেবল উপজেলা অফিসে বসেই বাল্য বিয়েমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করে বাল্য বিয়ে বন্ধ হবে না। তারা মনে করেন, প্রথম ঘোষণার পর যেভাবে বাল্যবিবাহ বেড়েছিল এবারও একইভাবে বাল্য বিয়ে বৃদ্ধি পাবে। বরং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিই মূল হাতিয়ার হওয়া উচিত।
ইউএনও আজাহার আলী বলেন, প্রথম দফার ঘোষণার পরও কিছু বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসন আইনী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী এবারও শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হলো। স্থানীয়দের প্রত্যাশা-মাঠে নয়, কাগজেই সাফল্য?, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে শিবগঞ্জ উপজেলাকে সত্যিকার অর্থেই বাল্যবিবাহমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হোক।
বাল্যবিয়েমুক্ত ঘোষণা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিকাহ রেজিষ্টার সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুল বারী বলেন, এটি একটি অতিরঞ্জিত, অতি উৎসাহী এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজ। বাল্যবিয়ে বিষয়ে জেলায় কোন গ্রহণযোগ্য জরিপ নেই। কোন অনুমান নির্ভর তথ্য নিয়ে একটি উপজেলাকে বাল্য বিয়েমুক্ত ঘোষণা করা একটি মুখোরাচক বিষয়। এসব নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান অনেক মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ পেয়ে থাকে। সেই অর্থ খরচ এর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে লোকদেখানো প্রচারণার অংশ এই বাল্যবিয়েমুক্ত ঘোষণা করা। তিনি বলেন, কোন অবস্থাতেই কোন উপজেলাকে বাল্য বিয়ে মুক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ নিকাহ রেজিষ্ট্রারগণ যখন কোন বিয়ে রেজিষ্ট্রি করেন, তখন অনেক নিয়মের কথা আসে, কিন্তু সরকারীভাবে নোটারী পাবলিক প্রক্রিয়ায় দেদারসে বাল্য বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে, সেটার তো বৈধতা আইনগতভাবে দেয়া হচ্ছে। তাই সাধারণ মানুষকে এভাবে ভুল তথ্য দিয়ে কোন কাজ করা সটিক নয়।

Leave a Reply